ঢাকা , রবিবার, ১৭ মে ২০২৬ , ২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

প্রাচীনকালে হজযাত্রার প্রধান পথগুলো

  • আপলোড সময় : ১৭-০৫-২০২৬ ০২:১৩:৩৬ পূর্বাহ্ন
  • আপডেট সময় : ১৭-০৫-২০২৬ ০২:১৩:৩৬ পূর্বাহ্ন
প্রাচীনকালে হজযাত্রার প্রধান পথগুলো

ইসলামপূর্ব যুগ থেকে আরবের বিস্তীর্ণ অঞ্চল থেকে পবিত্র কাবাঘর তাওয়াফ করতে মানুষ মক্কায় সমবেত হতো, সে সময়ও ছিল হজের বার্ষিক কার্যক্রম। ইসলাম হজকে ফরজ করার পর মক্কা ও মদিনার অভিমুখে মানুষের স্রোতধারা আরো প্রবল হয়। পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মুসলিমরা আসতে থাকে পবিত্র দুই নগরীতে। তারা সড়ক ও নৌপথে পাড়ি দেয় হাজার মাইলের দূরত্ব। তাদের গমনাগমনের ফলে কয়েকটি প্রধান প্রধান হজপথের সৃষ্টি হয়। ইসলামের প্রাথমিক যুগ থেকে আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগ পর্যন্ত হজযাত্রীরা এসব পথ ব্যবহার করত।

বণিজ্যপথ থেকে হজপথ
পবিত্র মক্কা ও মদিনা নগরীর চারদিক বিবেচনা করলে হজের প্রাচীন চারটি। তা হলো মিসরীয় পথ, শামের পথ, ইরাকি পথ ও ইয়েমেনি পথ। ইসলামপূর্ব যুগে এই পথগুলো ছিল আরবের প্রধান বাণিজ্য পথ। এই পথে আরব গোত্রগুলো বাণিজ্য কাফেলা পরিচালনা করত। ইসলাম আগমনের পর সেগুলো হজপথে রূপান্তরিত হয়। প্রাচীনকালে পথগুলো পরিচালনা করতেন খলিফা, আঞ্চলিক শাসক ও গোত্রপতিরা। এসব পথে যাত্রা বিরতির স্থান, বিশ্রামাগার, বাজার, মসজিদ ও পানির উত্স নির্মাণ করতেন। হজযাত্রীদের নিরাপত্তায় তারা বিশেষ পাহারার ব্যবস্থাও করতেন। অবশ্য ইসলামী ভূখণ্ডের সম্প্রসারণ ও ইসলামের প্রসার ঘটলে এই চার পথের পরিধি ও দূরত্ব বেড়েছিল এবং এর সাথে যুক্ত হয়েছিল আরো নতুন অনেক পথ। 

প্রাচীন হজপথের গুরুত্ব
প্রাচীন এসব পথ শুধু ধর্মীয় কারণে গুরুত্বপূর্ণ ছিল এমন নয়, বরং সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবও ছিল অপরিসীম। কেননা এই পথগুলো পৃথিবীর নানা প্রান্তের মানুষের ভেতর ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিনিময়ের কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। এই পথগুলো কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল বহু ঐতিহাসিক শহর, নগর ও বাণিজ্য কেন্দ্র। জেদ্দা, আসার, বাহরাইন, তাইজ, ইয়ামামা ও সানআর মতো ঐতিহাসিক নগরীর জন্মকথার সঙ্গে জড়িয়ে আছে হজপথের ইতিহাস। প্রাচীন হজপথের বিস্তারিত বিবরণ ইসলামের ইতিহাস বিষয়ক প্রাচীন গ্রন্থগুলোতে পাওয়া যায়। একাধিক মুসলিম ঐতিহাসিক হজের প্রাচীন পথগুলো চিহ্নিত করে গেছেন। 

হজের প্রধান চার পথ
হজের প্রধান চারটি প্রাচীন পথের বিবরণ তুলে ধরা হলো।
১. কুফা বা ইরাকি হজপথ : ঐতিহাসিক এই হজপথটি দারবে জুবায়দা নামেও পরিচিত। হজের প্রাচীন পথগুলোর ভেতর এটিই সবচেয়ে বিখ্যাত। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাহাবি সাআদ বিন আবি ওয়াক্কাস (রা.)-এর নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী সর্বপ্রথম এই পথ ধরে ইরাকে অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। এই পথ ইরাকের রাজধানী বাগদাদ থেকে শুরু হয়ে মক্কায় শেষ হয়েছে। আব্বাসীয় খেলাফতের সময় কুফা হজপথটি সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক গুরুত্ব লাভ করেছিল। কেননা তা ইসলামী খেলাফতের রাজধানী বাগদাদের সঙ্গে পবিত্র দুই দুই মসজিদের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করেছিল। এই পথে আইনে জুবায়দা (নাহরে জুবায়দা)-সহ হজ সম্পর্কিত একাধিক ঐতিহাসিক নিদর্শন আছে। কুফা হজপথের ধারে গড়ে উঠেছিল প্রাচীন ইসলামী শহর জুবালা, সা’লাবিয়া ও রাবাতা। আধুনিক সৌদি আরবের এই পথের সীমানা হলো আকাবা স্টেশন থেকে মক্কার উত্তর প্রান্ত পর্যন্ত।
২. শামি হজপথ : হজের প্রাচীন পথগুলোর একটি শামি হজপথ বা দারবুল শাম। বৃহত্তর শাম অঞ্চল তথা সিরিয়া, জর্ডান, লেবানন ও ফিলিস্তিন অঞ্চলের হজযাত্রীরা এই পথে হজে আগমন করত। শামি হজপথের সূচনা ধরা হয় দামেশক শহরকে। এরপর তা সিরিয়া, জর্ডান, উত্তর আরব, হিজাজ অতিক্রম করে মদিনা হয়ে মক্কায় পৌঁছায়। এই পথের হজযাত্রীরা মরুভূমি, পাহাড় ও শুষ্ক উপত্যকা অতিক্রম করত। তারা যাত্রাপথে কসর আল আজরাক, মাআন, তাবুক ও আল উলাতে যাত্রা বিরতি দিত, বিশ্রাম করত এবং পাথেয় সংগ্রহ করত।

শামি হজপথটি মূলত আরবের সবচেয়ে পুরাতন ও জনপ্রিয় বাণিজ্য পথ ছিল। উমাইয়া খেলাফতের সময় এই পথ বিশেষ গুরুত্ব লাভ করেছিল। তারা এই পথে হজযাত্রার সহায়ক অনেক অবকাঠামো নির্মাণ করেছিল। আব্বাসীয় শাসকরাও এই পথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উদ্যোগ নিয়েছিল। উসমানীয় শাসকদের আমলে এই পথের সর্বোচ্চ উন্নয়ন ঘটেছিল। উসমানীয় শাসকরা হজ কাফেলা পরিচালনার জন্য আমিরুল হজ এবং নিরাপত্তার জন্য সেনা দল নিযুক্ত করেছিল। তারা এই পথে একাধিক নিরাপত্তা চৌকি, দুর্গ, সরাইখানা ও পানির উত্স নির্মাণ করেছিল। বিশ শতকের শুরুতে তারা এই পথে হেজাজ রেলওয়ে নামে একটি যুগান্তকরী যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিল।

৩. মিসরীয় হজপথ: ইসলামের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ হজপথ মিসরীয় হজপথ। এই পথ ধরে মিসর, সুদান, মধ্য আফ্রিকা, উত্তর আফ্রিকা, আন্দালুস (মুসলিম স্পেন) ও সিসিলির মুসলিম হজে গমন করত। এই পথের বৈশিষ্ট্য হলো এর একাংশ কখনো কখনো জাহাজে অতিক্রম করা হতো। আফ্রিকা ও স্পেনের হাজিরা মিসরের কায়রোয় মিলিত হতো। সেখান থেকে তারা সিনাই উপত্যকা অতিক্রম করে লোহিত সাগরের তীর ধরে এগিয়ে যেত। লোহিত সাগরের তীরে এসে হজ কাফেলা দুটি পৃথক পথ ব্যবহার করত। প্রথমটি শাগাব, বাইদাসহ অন্যান্য জনপদের ভেতর দিয়ে মদিনায় যেয়ে শেষ হতো। দ্বিতীয়টি উপকূল ধরে আল আইনুনা, আল মুওয়ালিহ, ধুবা, আল হুরা ও নাবাত অতিক্রম করে মক্কায় যেয়ে শেষ হতো।

অন্যান্য হজপথের মতো এই পথেও মুসলিম শাসকরা যুগে যুগে অনেক অবকাঠামো নির্মাণ করেছে। এই পথের উন্নয়নে প্রথম মনোযোগ দিয়েছিল ফাতেমি শাসকরা। তাদের পর মামলুক ও উসমানীয়রাও এই পথের উন্নয়নে অবদান রাখেন। তারা পথের ধারে পানির নালা, কূপ ও পুকুর খনন করেন। দুর্গ, নিরাপত্তা চৌকি, বিশ্রামাগার, বাজার ও মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন। আধুনিক নৌযান আবিষ্কারের পর হাজিরা মিসরের আলেকজেন্দ্রিয়া থেকে জেদ্দা পর্যন্ত জাহাজে গমন করত। প্রাচীন এই হজপথে অনেকগুলো ঐতিহাসিক নিদর্শনও রয়েছে। যেমন ওয়াদি দিবার সাতটি কূপ, ইয়ানবুর খান আল-উশারা ও বদর মসজিদ।

৪. ইয়েমেনি হজপথ : আরব উপদ্বীপের দক্ষিণ প্রান্ত ধরে ইয়েমেনের হাজিরা মক্কা-মদিনায় গমন করত। ইয়েমেনের উচ্চভূমির ওপর দিয়ে এই রাস্তা অগ্রসর হওয়ায় এর অপর নাম ‘আদ-দারবুল উলয়া ইয়েমেনিয়া’। ইয়েমেনি হজপথ জল ও স্থল পথের সমন্বয়ে গঠিত হয়েছিল। হাজিরা একাধিক সমুদ্র বন্দর অতিক্রম করে গন্তব্যে পৌঁছাতেন। যেমন আল-সিরিন, আল-লাইস ও জেদ্দা। ইয়েমেনের সঙ্গে আরব উপদ্বীপের উত্তরাংশের সঙ্গে একাধিক বাণিজ্যপথ থাকায় স্থলপথটি একাধিক শাখায় বিভক্ত ছিল। এর ভেতর একটি খ্রিস্টপূর্ব হাজার অব্দেরও পুরাতন, যে পথ ধরে ইয়েমেনের সাবার রানি বিলকিস ফিলিস্তিনের নবী ও শাসক সুলাইমান (আ.)-এর সঙ্গে সাক্ষাত্ করতে যান, যার বর্ণনা পবিত্র কোরআনেও পাওয়া যায়। এডেন, তায়িজ, সানা, জাবিদ, সাআদা, তুরুবাহ, তায়েফ ইত্যাদি শহর এই হজপথের সঙ্গে যুক্ত ছিল। সবুজ উপত্যকা ও জনপদের ভেতর দিয়ে হজপথটি অতিক্রম করায় তা মূল নিরাপদ ও কম কষ্টকর ছিল।

অন্যান্য হজপথ
উল্লিখিত চারটি হজপথ ছাড়াও প্রাচীন আরবে আরো তিনটি হজপথের সন্ধান পাওয়া যায়। তা হলো, 
৫. বসরা হজপথ : এই পথের সূচনা হয়েছিল বসরা নগরী থেকে এবং শেষ হয়েছে মক্কায়। পথটি আরব উপদ্বীপের উত্তর-পূর্ব প্রান্ত অতিক্রম করে ওয়াদি আল-বাতিনে প্রবেশ করে। বসরা হজপথ বেশ কয়েকটি মরু অঞ্চল অতিক্রম করেছে। যার মধ্যে সবচেয়ে দুর্গম হলো দাহানা মরুভূমি। এরপর তা (আধুনিক সৌদি আরবের) আল কাসিম প্রদেশ অতিক্রম করে কুফা হজপথের সমান্তরলে অগ্রসর হয়। এভাবে উভয় পথ উম্মে খুরমান বা আওতাসে এসে মিলিত হয়, যা জাতুল ইরক থেকে ১০ মাইল দূরে অবস্থিত। বসরা হজ পথটি পুনরায় কুফা হজ পথের সঙ্গে আন-নুকরায় এসে মিলিত হয়েছে। সেখান থেকে একটি শাখা পথ মদিনার দিকে অগ্রসর হয়েছে। বসরা হজপথের দৈর্ঘ্য এক হাজার ৫২০ কিলোমিটার। এতে মোট ২৭টি যাত্রা বিরতির স্থান ছিল। যার মধ্যে চারটি ইরাক-কুয়েত সীমান্তে অবস্থিত এবং অবশিষ্টগুলো সৌদি আরবের ভেতর অবস্থিত। প্রাচীনকালে ইরাক থেকে হাজিদের বড় অংশ এই পথে যাতায়াত করত। পথটি তুলনামূলক দুর্গম হলেও যাত্রা বিরতির এক স্থান থেকে অন্য স্থানের দূরত্ব কম হওয়ায় হাজিরা সহজেই পাথেয় সংগ্রহ করতে পারত। 

৬. ওমানি হজপথ : ওমানি হজ পথ আরব উপদ্বীপের দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলকে পবিত্র দুই মসজিদের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এর দুটি শাখা ছিল। একটি উত্তর দিকে অগ্রসর হয়ে সৌদি আরবের পূর্ব উপকূল হয়ে পশ্চিমের ইয়ামামার দিকে এগিয়ে গেছে। এরপর তা দারিয়াহতে এসে বসরা-বাহরাইন হজ পথের সঙ্গে মিলিত হয়। অন্য পথটি ওমানের পশ্চিমের দোফার ও ফারাক হয়ে অগ্রসর হয়েছে। এই পথটি ফার্ক থেকে ওয়াখলান, হাবাহ উপকূল ও শাহোর হয়ে ইয়েমেনি পথের সঙ্গে যুক্ত হয়। 

৭. মক্কা-মদিনা সংযোগ সড়ক: হজের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পথ হলো মক্কা-মদিনা মহাসড়ক। মহানবী (সা.) ৬২৯ হিজরিতে মক্কা বিজয় অভিযানের সময় যে পথে আগমন করেছিলেন সেটাই ছিল দুই নগরীর ভেতর প্রথম সংযোগ সড়ক। এটাও হজের একটি প্রাচীন পথ।

সূত্র : সৌদি পিডিয়া, আরব নিউজ, সৌদি প্রেস এজেন্সি ও ইউনেস্কোর নিজস্ব ওয়েবসাইট।


নিউজটি আপডেট করেছেন : সাজিদুল ইসলাম পাঠান

কমেন্ট বক্স